জৌলুস হারানো ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কয়েক হাজার একর জমি এখন গলার কাটা হয়ে দেখা দিয়েছে। জমিগুলো কালক্রমে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। লুট হচ্ছে সেচ খালের মুল্যবান গাছ। পাউবোর জমির উপর অবৈধ স্থপনা গড়ে উঠছে।
শাখা কর্মকর্তারা চুরি করে গাছ বিক্রি করে দিচ্ছে। এদিকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে বারবার পাউবোর ঢাকা অফিস থেকে তাগাদা দেওয়ার পরও নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যর্থ হচ্ছে।
ফলে দিনকে দিন বেহাত হচ্ছে কোটি কোটি টাকা মুল্যের সম্পদ। জনবলের দোহায় দিয়ে জেলা ব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে পাউবো কর্মকর্তারা। দখলকৃত সম্পদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন গ্রামে ১৯৬১ সালে নির্মিত অফিস, ব্যারাক, বাসাবাড়ি, রেষ্ট হাউস, গার্ডসেড, পরিত্যক্ত খাল ও খাল পাড়ের জমি।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, ষাটের দশকে গঙ্গা কপোতাক্ষ (জিকে) প্রজেক্টের আওয়তায় ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় ১৯৬১ সালে পাউবোর দপ্তর প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৫৭ সালের দিকে ঝিনাইদহের তিনটি উপজেলার ৯৫৯টি মৌজায় তৎকালীন সময়ের ৭৬ লাখ টাকা মুল্যমানের সাত হাজার ছাব্বিশ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পাউবোর আগের মতো জোয়ার না থাকায় এই বিপুল পরিমান জমি বিভাগটির এখন গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। অধিগ্রহণকৃত জমির মধ্যে রয়েছে ঝিনাইদহে ৭৪০.৫৬ একর, হরিণাকুন্ডু উপজেলায় ২১১৪ একর ও শৈলকুপা উপজেলায় ৪১৭১ একর জমি। বর্তমান এই বিপুল পরিমান জমির মুল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে এই জমির মুল্য তিন হাজার কোটি টাকার বেশি হবে। সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, আলমডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া প্রধান খাল থেকে ঝিনাইদহের ৩টি উপজেলায় সেচের পানি সরবরাহ করা হয়। আলমডাঙ্গা প্রধান খাল থেকে শাখা খালগুলো এস-১ নামে চি‎হিত।
এরপর সেকেন্ডারী খাল, টারসারি ও ড্রেনেজ খাল গুলো শাখা খাল থেকে পানি সরবরাহ করে জমিতে চাষকাজ করা হতো। বর্তমান বেশির ভাগ টারসারি ও ড্রেনেজ ভরাট হয়ে গেছে। শাখা খালেও আগের মতো পানি থাকে না। পাউবোর সুত্রে জানা গেছে, সে সময় দপ্তরের কয়েক হাজার কর্মকর্তা কর্মচারীর জন্য ঝিনাইদহে ২৭টি, হরিণাকুন্ডুতে ৩৮টি ও শৈলকুপায় ১০২টি অফিস, ব্যারাক, বাসাবাড়ি, রেষ্ট হাউস ও গার্ডসেড নির্মান করা হয়। কিন্তু ঝিনাইদহের কয়েকটি বিভাগ বিলুপ্ত ও কর্মকর্তা কর্মচারীরা অবসরে যাওয়ার কারণে বেশির ভাগ ভবন পরিত্যক্ত রয়েছে।
গ্রামাঞ্চলে পড়ে থাকা এ সব পরিত্যক্ত ভবন কালক্রমে বেদল হয়ে যাচ্ছে। সরেজমিন ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মথুরাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে পাউবোর মথুরাপুর শাখা কলোনীর সেচ পরিদর্শকের দপ্তরটি অরক্ষিত। একই উপজেলার ভাটই বাজারের অফিসটি এখন পুলিশ ফাঁড়ি করা হয়েছে। মথুরাপুর সেচ পরিদর্শকের দপ্তরটি দেখভালের জন্য মোহাম্মদ আলী নামে এক গার্ড থাকলেও তিনি অবসরে যাওয়ার কারণে তার ভাই সিদ্দিক হোসেনকে দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মথুরাপুর শাখা কলোনীতে ২ একর ৮৫ শতক জমির উপর বিরাট বিরাট ভবন ও মুল্যবান গাছপালা রয়েছে। পাউবোর কোন কর্মকর্তা সেখানে যান না বলে সিদ্দিক হোসেন জানান। স্থানীয় গ্রামবাসি তরিকুল ইসলাম জানান, রামচন্দ্রপুর থেকে রাজনগর পর্যন্ত সেচ খালটি মরে যাওয়ার পরই খালের জমি আস্তে আস্তে দখল হয়ে গেছে।
তিনি অভিযোগ করেন পাউবোর এই পরিত্যক্ত সম্পদ দেখভাল করতে গ্রামাঞ্চলে কোন কর্মকর্তা কর্মচারী বছরে একবারও আসেন না। সেই সুযোগে দখলদাররা বেপরোয়া ভাবে সরকারী সম্পদ দখল করে নিচ্ছে। হরিণাকুন্ডু উপজেলার শাখারীদহ বাজারে পাউবোর জমিতে অবৈধ দোকান পাট গজিয়ে উঠেছে। একই উপজেলার সাতব্রীজ, পার্বতীপুর বাজার, বরিশখালী, চটকাবাড়িয়া ও শ্রীরামপুর গ্রামে পাউবোর জমিতে স্থাপনা তৈরী করা হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভুমি ও রাজস্ব পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নরেশ চন্দ্র নাথ গত ১৬ জুলাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের দখলকৃত জমি উদ্ধার সংক্রান্ত প্রতিবেদন চেয়ে ঝিনাইদহ পাউবোকে চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয় পাউবোর সম্পত্তি উদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণসহ গৃহীত ব্যবস্থার মাসিক অগ্রগতির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের জন্য বার বার তাগাদা দেওয়ার পরও কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
হাঃ নায়েব আলী স্বাক্ষরিত আরেক চিঠি থেকে জানা গেছে দেশের ৩০টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তিন হাজার চার’শ একষট্টি একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। এ বিষয়ে ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (শৈলকুপা) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী কনক কুমার বিশ্বাস জানান, আমরা দখলকৃত সম্পদের তালিকা তৈরী করে প্রশাসনের সহায়তায় উদ্ধারে ব্যবস্থা গ্রহনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কথা হলে ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ জানান, ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোন জমি বে-দখলে নেই। তবে পরিত্যক্ত ভবনগুলো ভাড়া দিয়ে ২২ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করা হয়েছে। শৈলকুপার লাঙ্গলবাধ বাজারে বেদখলী কিছু জমিও উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি দাবী করেন। তিনি জানান, জিকে প্রজেক্টের বয়স অনুয়ায়ী ভবনের টেম্পার শেষ। আগে হাজার হাজার লোক ছিল। এখন সারা জেলায় এক’শ লোকও নেই। লোকজনের অভাবে বিপুল পরিমান সম্পদ দেখভাল করা কষ্টসাধ্য বলে তিনি মনে করেন।
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...
আরো সংবাদ পড়ুন