রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু যশোর সদর। সদর উপজেলা নিয়ে যশোর- ৩ আসন গঠিত। এই আসনে এখন পর্যন্ত নয় জন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে এরমধ্যে আওয়ামী লীগ থেকে ৪ জন। এছাড়া রয়েছে মাহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা রবিউল আলম। অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের একক নাম শোনা গেছে। তবে এই আসন নিয়ে আওয়ামী লীগে চলছে নানা হিসাব। কে হবেন দলীয় প্রার্থী এখনও তা স্পষ্ট না। গত সাড়ে ৪ বছরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বেশ কয়েকজন দলীয় কর্মী খুন হয়েছে দলের প্রতিপক্ষের হাতে। এখানে একপক্ষ অপরপক্ষকে এক বিন্দু ছাড় দিতে নারাজ। তবে ২১ সেপ্টেম্বর যশোর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় দেখা গেছে অন্যরকম দৃশ্য। এখানে এমপি খালেদুর রহমান টিটো ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার পাশাপাশি বসে বক্তব্য রাখতে দেখা গেছে। সভায় আগামী নির্বাচনে দলের মধ্যে গতিশীল ও নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই দুই নেতার মধ্যে শুরু থেকেই কোন্দল থাকলেও সভার এ দৃশ্য অনেককে আশান্বিত করেছে। কিন্ত কেউ কেউ বলছেন, দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যশোরে আসছেন শীঘ্রই। তাদের যশোর আসাকে ঘিরে দলের কোন্দল মেটানো এখন জরুরি মনে করছেন। তবে আগামী নির্বাচনে দুই নেতা কেউ কাউকে ছাড় দিবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ করছেন অনেকে।
সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী খালেদুর রহমান টিটোর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনে এই আসনে ভোটার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৬৫৮ জন। এবার এই আসনে ৩৪ হাজার ৩১ জন ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬৮৯ জন। এই আসনে তরিকুল ইসলামের প্রার্থীতা একেবারে নিশ্চিত। তরিকুল ইসলামের বিকল্প এখানে বিএনপির কোন প্রার্থী নেই। তবে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখানে চরম আকার ধারণ করেছে। এক সময়ের জাতীয় পার্টির মহাসচিব খালেদুর রহমান টিটো বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন। সে সময় তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন বলে ঘোষণাও দেন। কিছু দিন রাজনীতি থেকে দুরে থাকেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসেন। এবার তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে চুড়ান্ত মনোনয়ন পান। তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য হিসেবে জয়লাভ করেন। কিন্তু গত ৫ বছরে দলে তার কোন অবস্থান নেই বললেই চলে। তিনি এমপি হবার পর দলীয় অফিসটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হন। এছাড়া তার ছেলেরা নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যে কারণে তার অতীত ভুলে মানুষ এখন দুর্নীতিবাজ হিসেবেই চেনে। এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে তার রয়েছে চরম বিরোধ। শাসক দলের এমপি হিসেবে খালেদুর রহমান টিটোর সাথে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কিম্বা সাধারণ সম্পাদককে খুব একটা দেখা যায়নি। এখানে আওয়ামী লীগ এখন ত্রিধারায় বিভক্ত। বর্তমানে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের চার জন মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য খালেদুর রহমান টিটো, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য আলী রেজা রাজু, সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার ও দলের কেন্দ্রীয় উপ কমিটির নেতা কাজী নাবিল আহমেদ। এই আসনে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা হিসেবে দলের জেলা সভাপতি সাবেক এমপি আলী রেজা রাজুর জনপ্রিয়তা শীর্ষে রয়েছে। তিনি জননেতা হিসেবে যশোরে পরিচিত। অপরদিকে, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারেরও বেশি জনপ্রিয়তা রয়েছে। গ্রাম পর্যায়ে একটা ভালো ভোট রয়েছে শাহীন চাকলাদারের। তবে তার নামে বেশ কিছু অপপ্রচারও রয়েছে। দলের বিতর্কিত লোকদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি তার বিরুদ্ধে। অপরদিকে, যশোরে চশমা লীগ হিসেবে পরিচিত কাজী নাবিল আহমেদ। ২০০১ সালের নির্বাচনে কাজী নাবিল আহমেদের বাবা কাজী শাহেদ আহমেদ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। এতে করে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলী রেজা রাজু পরাজিত হন। দলের একটা সুবিধাবাদী অংশের সাথে কাজী নাবিল আহমেদের সুসম্পর্ক রয়েছে। তাদেরকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে তিনি দলের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আগামী নির্বাচনে মনোনয়নের প্রত্যাশায় এই চার প্রার্থীই চেষ্টা করছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কে মনোনয়ন পবেন তা বলা যাচ্ছে না। আবার এই আসনে মহাজোটের অন্যতম শরীক জাতীয় পার্টির দুই জন মনোনয়নের প্রত্যাশায় দৌড়াচ্ছেন। তারা হলেন জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন রাজিব ও সাবেক সভাপতি কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুবুল আলম বাচ্চু। জাতীয় পার্টি যদি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয় তাহলে এই আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন মাহবুবুল আলম বাচ্চু। তার মনোনয়নটা পার্টির চেয়ারম্যান হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ নিশ্চিত করেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। এছাড়া মহাজোটের আরেক শরীক জাসদ। জাসদ থেকে এই আসনে নির্বাচন করতে চান দলের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি ও সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট রবিউল আলম। মহাজোট সরকার গঠন হবার পর যশোরের শরীক দলগুলো নানাভাবে বঞ্চিত হয়েছে। মহাজোট থেকে আওয়ামী লীগ কোন নির্বাচনে শরীকদের জন্য ছাড় দেয়নি। যে কারণে এবার শরীকরাও ছাড় দিতে নারাজ। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মহাজোটের শরীকদের কোন ছাড় দেয়নি আওয়ামী লীগ। যে কারণে আগামী দশম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে রবিউল আলম সদর আসন থেকে নির্বাচন করতে মনোনয়ন চাইবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তাছাড়া তিনি আওয়ামী লীগের কোন্দলের সুযোগ নিতে চান। এছাড়া এ আসন থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে মিয়া মোহাম্মদ আব্দুল হালিমকে। তবে তাকে খুব একটা আলোচনায় দেখা যাচ্ছে না। এখানে মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের নাম বেশ জোরে শোরে শোনা যাচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের কোন্দলের কারণে বিএনপির জয়লাভ খুব সহজে সম্ভব বলে মনে করছেন এখানকার ভোটাররা। এছাড়া গত ৫ বছরে এখানে উন্নয়নের ছোঁয়া খুব একটা লাগেনি। নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগ। যে কারণে ভোটারা তাদের প্রত্যাশা পূরণে আওয়ামী লীগের বিকল্প প্রার্থীকেই নির্বাচনে ভোট দিবে বলে ভোটারদের সূত্রে জানা গেছে। আর এতে করেই তরিকুল ইসলামের জয়লাভ খুব সহজ বলে ধরে নেওয়া যায়।

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...
আরো সংবাদ পড়ুন