বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, “২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি কেএম হাসানকে না মানলে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে কেন নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে মানবো।” সোমবার বিকেলে রাজশাহীতে ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশে খালেদা জিয়া এ কথা বলেন।
রাজশাহী মহানগরীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে বেলা ২টায় জনসভার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও বেলা ১২টার মধ্যেই মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে খালেদা জিয়া সমাবেশস্থলে পৌঁছালে সমবেত নেতাকর্মীরা করতালি দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানায়। এ সময় খালেদা জিয়াও হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন।
তত্ত্বাবধায়ক জনদাবি
বেগম জিয়া বলেন, “১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে আন্দোলন করে তখন তো তা সংবিধানে ছিল না। তাহলে আপনারা কেন চেয়েছিলেন। সেদিন আমরা আপনাদের দাবি মেনেছিলাম, আজ আমাদেরটা মানুন।”
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, “সেদিন  আপনারা অন্যায় দাবি করে ১৭৩ দিন হরতাল করেছিলেন। সেদিন জাতীয় পার্টি-জামায়াতও আপনাদের সঙ্গে ছিল। আজ আমাদের জনদাবি মেনে নিন।”
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, “আপনারা সংবিধানের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছেন। সংবিধান তো জনগণের জন্য। তত্ত্বাবধায়ক এখন জনদাবি। এ দাবি জনগণের স্বার্থেই মেনে নিতে হবে।”
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী এত বেশি দুর্নীতি করেছেন যে এখন ক্ষমতা ছাড়তে ভয় পাচ্ছেন। এজন্য তিনি আজীবন ক্ষমতায় থাকার ষড়যন্ত্র করছেন।
‘‘কোনোভাবেই হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে না’’-উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘হাসিনাকে পদত্যাগ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা না হলে ঈদের পরে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে।’’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন- তা নিয়ে আলোচনার আহ্বা্ন জানান তিনি।
নৌকা ফুটো হয়ে গেছে
খালেদা জিয়া তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘আইন ভঙ্গ করে প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিয়ত নৌকায় ভোট চাচ্ছেন। কিন্তু নৌকা ফুটো হয়ে গেছে। তাই পানি উঠতে উঠতে নৌকা ডুবতে বসেছে। নৌকা তলিয়ে যাচ্ছে।ওই নৌকায় কেউ উঠবে না।’’
আলোচনার জন্য এখনও সময় আছে উল্লেখ করে বেগম জিয়া বলেন, ‘‘আমরা আলোচনা করতে চাই। দেশের উন্নয়ন করতে চাই।’’
ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে সরকার সংবিধান সংশোধন করেছে- এমন অভিযোগ এনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, “বিচারপতি কে এম হাসানের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু কে এম হাসানকে আপনারা গ্রহণ করেননি। তাহলে দলীয় প্রধান হিসেবে এখন আপনাকে আমরা কী করে মানব?’’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘সংবিধান মানুষের জন্য। যেহেতু সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দিয়েছে। তাই এ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারের।’’
সংসদ ভেঙে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা না করলে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দেন তিনি। বলেন, ‘‘এর পরিণতি যা হওয়ার তা-ই হবে।’’ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে না আনলে আওয়ামী লীগের পালানোর সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
১৮ দলীয় জোটের বাইরে যারা আছেন তাদের সকল ভেদাভেদ ভুলে নির্দলীয় সরকারের দাবির আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহবান জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘‘দেশ রক্ষার জন্য সকলেই এক সাথে দাঁড়াব। এক সাথে বসব। দেখি কেমন করে সরকার গুলি চালায়। কে ছোট কে বড়, কে ডান কে বাম, কে বড় নেতা ছিলেন সেটা ভুলে আসুন দেশ রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হই।” তিনি বলেন, ‘‘দেশ রক্ষার একমাত্র পথ হচ্ছে এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো এবং আওয়ামী লীগের বিদায়।”
বিএনপি চেয়ারাপারসন বলেন,‘‘এই সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে চায়। কারণ এই পাঁচ বছরে তারা ব্যাপক দুর্নীতি করেছে। কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট করে মানুষ বিদ্যুৎ পায় না। শূন্য হয়ে গেছে সোনালী ব্যাংক। আওয়ামী লীগের নেতারা ব্যাংক লুটেপুটে নিয়ে গেছে। এগুলো মানা যায় না। প্রতিবাদ করতে হবে।”
এই সরকারের আমলে প্রায় ১৮ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে- এমন দাবি করে তিনি বলেন, “সরকারের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দুর্নীতির তথ্য থাকায় সাগর-রুনিকে হত্যা করা হয়েছে।গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে এখন নতুন নতুন  আইন করার কথা বলছে সরকার।”
পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘‘আপনারাও দেশের নাগরিক। আপনাদেরও ছেলে মেয়ে আছে।সরকারের আর মাত্র তিন মাস সময় আছে, তাই আর কোনো অন্যায় আদেশ মানবেন না।’’ বিএনপি ক্ষমতায় এলে  নির্দলীয়ভাবে প্রশাসন গড়ে তোলার ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। ক্ষমতায় গেলে বিএনপি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর প্রসঙ্গে তুলে ধরে তিনি বলেন,     ‘‘আমাদের বিশ্বাস ছিলো আমরা জনগণের কাছে যেতে পারব, তাই আমরা আপনাদের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি জানি আপনারা কতদূর যেতে পারবেন।’’
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘‘দেশের ৯০ভাগ মানুষ যখন নির্দলীয় সরকার চায়, তখন কেন আপনারা তা দেবেন না ?’’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রাজশাহীবাসী দেখিয়ে দিয়েছে চুরি করে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। এ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ দেখিয়ে দিয়েছে এখানে বিএনপি কত শক্তিশালী। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস।’’
তিনি বলেন ‘‘এই সরকার দেশের উন্নতি করার জন্য ক্ষমতায় আসেনি,বরং তারা এসেছে লুটপাট করে ক্ষমতায় থাকার জন্য।’’
জনগণকে নিয়ে মাদক নির্মূল করব
তরুণদের ধ্বংস করতে সীমান্ত থেকে মাদক সরবারহ করা হচ্ছে- এমন অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘তরুণরা আমাদের দেশের ভবিষ্যত। তাই যুব সমাজকে ধ্বংস করতেই আওয়ামী লীগ এই কাজ করছে। শুধু এখনই নয়, স্বাধীনতার পর থেকেই তারা এ কাজ করেছিল।’’
তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের সজাগ থাকতে হবে। বিএনপি ও ১৮দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে এই দেশ থেকে মাদক নির্মূল করা হবে। মাদক দেশ ও জাতির শত্রু। আমরা বিশ্বাস রাখি আমরা জনগণকে নিয়ে মাদক নির্মূল করতে পারবো।’’
সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানী হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘ফেলানীর লাশ কাঁটাতারে ঝুললো। ফেলানীর হত্যাকারীরা পার পেয়ে গেলো। কোনো বিচার হয়নি। আমাদের মুখ বন্ধ রাখতে সরকার নানা কালাকানুন করছে। অথচ সীমান্তে বাংলাদেশী নির্যাতনের বিষয়ে কিছু বলতে পারছে না। এ জন্য দেশপ্রেমিক স্বাধীনতার পক্ষে সরকার দরকার।’’
আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন,‘‘আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পক্ষের নয়, বিপক্ষের সরকার। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার হলে দেশকে অন্যের হাতে তুলে দিতে পারত না। আওয়ামী লীগ দেশ ও জনগণের শত্রু।মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি।’’
হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে সরকারের যৌথ বাহিনী যে প্রক্রিয়ায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে তার  সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর সাধারণ সম্পাদক আদিলুর রহমান খান, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহামুদুর রহমানকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে সরকার নির্যাতন করছে।’’
ড. ইউনূস বাংলাদেশের গর্ব
বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকার অপ্রপ্রচার চালাচ্ছে- অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন,‘‘ড. ইউনূস বাংলাদেশের গর্ব। অথচ সরকার তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়ার চেষ্টা করছে। সরকারকে বলবো, এই সব হয়রানি বন্ধ করুন। নইলে এর পরিণাম ভালো হবে না। না।’’
সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘‘সিলেটে ছাত্রলীগ চমক দেখিয়েছে। সিপিবির মতো একটি দলের উপর হামলা করে ২৫জনকে আহত করেছে। এটা হলো তাদের চমক।’’ হরতাল আহবানকারীদের দমনের জন্য আইন প্রণয়নের চেষ্টারও সমালোচনা করেন তিনি।
বিএনপি ক্ষমতায় গেলে অন্ধকার নয়,  অলোকিত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে বলে উল্লেখ করেন খালেদা জিয়া।
কোটা পদ্ধতি ১০ থেকে ১৫ ভাগে নামিয়ে আনা হবে
যুবকদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘পুলিশ-প্রশাসন, সিভিল প্রশাসন এমনকি সামরিক বাহিনীতে আওয়ামী লীগ দলীয় লোকদের নিয়োগ দিচ্ছে। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ সব জায়গায় দলনিরপেক্ষ, মেধাবী ও যোগ্য লোককে বসানো হবে। কোটা পদ্ধতি সংস্কার করে ১০ থেকে ১৫ ভাগে নামিয়ে আনা হবে বলেও জানান বেগম জিয়া।
বিএনপি ক্ষমতায় এলে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন হয়-আওয়ামী লীগের এমন বক্তব্যের জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘বিএনপি নয়, বরং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই হিন্দুদের ওপর নির্যাতন হয়। এদের সময় মন্দির, গীর্জা, বৌদ্ধ মন্দির ভাঙা হয়েছে। মেয়েদের ওপর নির্যাতন হয়। আমি কথা দিচ্ছি বিএনপি ক্ষমতায় এলে কারো ওপর নির্যাতন হবে না।’’
‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ উল্লেখ করে খালেদা জিয়া সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘‘যারা নির্যাতন করছে, সেসব গুন্ডা সামলান।’’
নির্বাচন কমিশন অপদার্থ
নির্বাচন কমিশনের  সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘‘এই কমিশন একটি অপদার্থ। তারা নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করেছে।’’
বিএনএফ নামের একটি দলকে কমিশন নিবন্ধন দেয়ার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ এখন ছোট ছোট দলের উপর নির্ভর করে নির্বাচন করতে চায়। আর নির্বাচন কমিশন বিএনএফকে নিবন্ধন দিয়ে গমের শীষ প্রতীক দিতে চায়। আমরা কমিশনকে বলতে চাই, সঠিকভাবে কাজ করুন। নইলে দেশের মানুষ আপনাদের ছাড়বে না।এমন অবস্থা হবে যে, ঘর থেকে বের হতে পারবে না। তাই এসব আকাম-কুকাম বাদ দিন।’’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. মিজানুর রহমান মিনু’র সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে.(অব.) মাহবুবুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমান পটল, শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলু, আমান উল্লাহ আমান, ব্যারিস্টার মাহাবুবউদ্দিন খোকন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম, মজলিসে শূরা সদস্য লতিফুর রহমান, মহানগর জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, লেবার পার্টির সভাপতি ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান,এনডিপি চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্তজা, ডেমোক্রেটিক লীগের মহাসচিব সাইফুদ্দিন মনি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম, যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মীর শরফত আলী শপু, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল প্রমুখ।
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...
আরো সংবাদ পড়ুন