যশোরের শার্শা উপজেলার কৃষক সাহেব আলী বোরো মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ধান বিক্রি করেন ৪৫০ টাকায়। সেচ খরচ পরিশোধের চাপ থাকায় মৌসুমের শুরুতেই ফড়িয়াদের কাছে এ দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি। সে ধানই ফড়িয়ারা এক মাস মজুদ রেখে স্থানীয় মোকামে বিক্রি করেন ৬০০ টাকায়। মজুদ সক্ষমতা থাকলে একই দাম পেতেন তিনিও।মৌসুম শুরুর দেড়-দুই মাস পর ধানের দাম নির্ধারণ ও সংগ্রহ অভিযান শুরু করে সরকার। এ সময় চাল সরবরাহের চাপ থাকায় মিলাররা স্থানীয় মোকাম থেকে ৬৮০-৭৫০ টাকা মণ দরে ধান কেনেন। কৃষকের ধান মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত ঘুরে মিলারদের কাছে পৌঁছতেই মণপ্রতি দাম বেড়ে যায় ২৩০-৩০০ টাকা। চাল তৈরির পর খুচরা বিক্রেতাদের হাত ঘুরে যখন তা ভোক্তার কাছে পৌঁছে, দাম তখন আরো বাড়ে।
এভাবে ধান উত্পাদন থেকে শুরু করে চাল তৈরি এবং তা ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত দামের বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে। চলতি মাসে প্রকাশিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘দ্য ট্রান্সফরমিং অব রাইস ভ্যালু চেইন ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া: ইমপ্লিকেশন ফর ফুড সিকিউরিটি’ শীর্ষক গবেষণায়ও এর প্রতিফলন ঘটেছে। তারা বলছে, ধান থেকে চাল উত্পাদন এবং তা ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছে পাঁচ ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘুরে। আর চালের দামের ৪০ শতাংশ যায় এ মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে।
এডিবির পর্যালোচনায়, মৌসুম ও মৌসুমের বাইরে গ্রামের ফড়িয়ারা মুনাফা করেন ৪৭-৫৫ শতাংশ। আর মোকামমালিকরা মুনাফা করেন ৫১-৬৮ শতাংশ। মধ্যস্বত্বভোগীদের এ উচ্চমুনাফায় ধানের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দেশের কৃষক। যদিও ভারতে এ মুনাফার প্রবণতা তুলনামূলক কম। ভারতে এ দুই ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফার হার যথাক্রমে ২৮-৪৫ ও ৩৮-৪০ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. জয়নাল আবেদীন এ প্রসঙ্গে বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের উত্থানের কারণেই বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। তবে বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম নির্ধারণের মাধ্যমে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যেতে পারে। এর সঙ্গে কৃষক যাতে ধান মজুদ বা সংরক্ষণ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করতে হবে। বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা বিপণন অধিদফতরকেও শক্তিশালী করতে হবে।
আর্থিক সঙ্গতি ও মজুদক্ষমতা না থাকায় বাধ্য হয়ে মৌসুমের শুরুতেই স্থানীয় ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। এডিবির প্রতিবেদন বলছে, গ্রামের ফড়িয়া কিংবা স্থানীয় মোকাম ব্যবসায়ীদের কাছে দেশের ৬৩ শতাংশ কৃষক ধান বিক্রি করেন। আর সরাসরি মিলমালিকদের কাছে ধান বিক্রি করছেন মাত্র ৩০ শতাংশ কৃষক, যারা দাম কিছুটা হলেও বেশি পাচ্ছেন।
এদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘প্রডাক্টিভিটি অ্যান্ড ইফিশিয়েন্সি অব রাইস মিলস ইন বাংলাদেশ: ইকোনমিক, সোস্যাল অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি ইমপ্লিকেশন’ ও ‘ইমপ্রুভিং ফুড সিকিউরিটি থ্রু ভ্যালু চেইন ম্যানেজমেন্ট: এ স্টাডি অব রাইস ভ্যালু চেইন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি চালের দাম ৬-১০ টাকা পর্যন্ত বাড়াচ্ছেন অটো রাইস মিলাররা। মিল স্থাপন, চাল প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ ও উন্নত প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ খরচের কারণেই পণ্যটির দাম বেড়ে যাচ্ছে। মিলারদের অতিমুনাফার প্রবণতা একে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে মিলাররা দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে দায়ী নন বলে জানান বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, মোকাম বা ফড়িয়াদের কাছ থেকে প্রায় ৮০০ টাকায় এক মণ ধান কেনার পর ২২-২৩ কেজি চাল পাওয়া যায়। এ চাল কোনো মুনাফা ছাড়াই বিক্রি করতে গেলে দাম পড়ে কেজিপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা। কিন্তু মাড়াই, বহন, মজুদ ও শ্রম খরচ যুক্ত করে ন্যূনতম মুনাফা রেখে চালের দাম নির্ধারণ করেন তারা।
কৃষক সরাসরি তাদের কাছে ধান বিক্রি করতে পারলে লাভবান হতেন বলে জানান তিনি। এজন্য কৃষকপর্যায়ে মজুদক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন খোরশেদ আলম।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে চালের উত্পাদন ছিল ৩ কোটি ২০ লাখ টন। পরের দুই অর্থবছরে তা বেড়ে হয় যথাক্রমে ৩ কোটি ৩৫ লাখ ৪১ হাজার ও ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার টন। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে আউশ, আমন ও বোরো মিলে দেশে চাল উত্পাদন হয়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৩৩ হাজার টন।
আরো সংবাদ পড়ুন
0 মন্তব্যসমূহ