শার্শা উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ১৮৬টি গ্রাম আর একটি পৌরসভা নিয়েই গঠিত যশোর-১ সংসদীয় আসন। সীমান্ত ঘেঁষা এ উপজেলায় জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। আর ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ।

গত সংসদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি ও আকিজ গ্রুপের অন্যতম পরিচালক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শেখ আফিল উদ্দিন জোটের প্রার্থী তৎকালীন জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আজিজুর রহমান ৮৮ হাজার ৭শ’ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। এ নির্বাচনে ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বাকি দু’জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

এ অঞ্চলের প্রার্থী ও সমর্থকদের কালো টাকার ছোঁয়ায় সংসদ নির্বাচন জমে উঠে জোরেসোরে। ভোট বেচা-কেনাও থেমে থাকে না এখানে। তবে এখানে সৎ ও আদর্শবান প্রার্থীর চেয়ে কালো টাকার মালিক আর প্রশাসনিক ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বেশি পছন্দ করেন কালোবাজারী, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক শ্রেণীর ভোটাররা। কারণ প্রশাসনের সঙ্গে সু-সম্পর্ক থাকলে এ জাতীয় ভোটারদের জীবন যাত্রার মান সচ্ছল হয়।


সীমান্ত অঞ্চলে নির্বাচন আসলেই যেন শুরু হয় ভোট উৎসব। তাই প্রতিবারের মত এবারও এ আসনটিতে আগামী সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে নেমে গেছেন।

যশোর-১ আসনের অধীনস্থ বেনাপোল, শার্শা, নাভারন ও বাগআঁচড়া বাজার এলাকাসহ গ্রামাঞ্চলের ছোট খাট বাজারগুলোতে বিভিন্ন প্রার্থীর রঙিন পোষ্টার ও বিল বোর্ড শোভা পাচ্ছে। সকল রাজনৈতিক দলের নেতারা সাধারণ ভোটারদের নানাভাবে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।

ত্রিমুখী লড়াইয়ে এ আসনটি মহাজোটের দখলে থাকলেও দ্বি-মুখী লড়াইয়ে জোটের নিশ্চিত জয় হয় প্রতিবারই। এ আসনে জামায়াত এবং জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগে গ্রুপিং রয়েছে প্রকট আকারে।

আওয়ামীলীগ : যশোর-১ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আফিল উদ্দিন, শার্শা উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান, বেনাপোল পৌর মেয়র ও আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক আশরাফুল আলম লিটন ও ইমিগ্রেশন এন্ড পাসপোর্টের ডিজি আব্দুল মাবুদ পিপিএম।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন বেমালুম তার প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেছেন। এলাকার উন্নয়নে চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো কাজই হয়নি। তার কিছু নিজস্ব লোক কোটিপতি হয়ে গেছে।

পুটখালিসহ সীমান্তের বিভিন্ন চোরাচালানী ঘাট বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গত ৪ বছরে শার্শায় আলোচিত কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগই খুনের শিকার আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলের হ্যান্ডলিং শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে তার বিরুদ্ধে নানা কথা চাওড় রয়েছে।

অবশ্য আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের ভাষ্য হচ্ছে শেখ আফিল উদ্দিন এমপি হওয়ার পর শার্শার চেহারা পাল্টে গেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা নেই।

শার্শা উপজেলার দুই দুই বার নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান প্রবীণ রাজনীতিবিধ আব্দুল মান্নান মিন্নু ব্যাপক জনসমর্থন আশা করে তিনি এবার উঠে এসেছেন সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায়। তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে বসছেন নড়েচড়ে। সে লক্ষ্যে তিনি লবিং শুরু করেছেন কেন্দ্রীয়ভাবে।

সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আরো যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন। গত পৌরসভা নির্বাচনে জয় লাভ করার পর বেনাপোলে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এ সুযোগটা কাজে লাগাতেই তার নাম সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় উঠে এসেছে।

এছাড়া ইমিগ্রেশন এন্ড পাসপোর্ট এর ডিজি আব্দুল মাবুদ পিপিএম এর নাম শোনা যাচ্ছে এ আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে। তবে অন্যদের তুলনায় তার জনসমর্থন তেমন নেই। উত্তর শার্শায় তার বাড়ি হওয়ায় সেখানকার একটি ইউনিয়নেই তার পরিচিতি। 


বিএনপি : বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হচ্ছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক আলহাজ্ব মহসিন কবীর, যশোর জেলা কমিটির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব শামছুর রহমান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি ও শার্শা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান জহির। ধানের শীষের টিকিট পেতে দলের এসব নেতা চেষ্টা তদবির চালাচ্ছেন। এলাকায় জনসংযোগ বা সভা সমাবেশ করার পাশাপাশি দলের হাই কমান্ডের সঙ্গে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। আওয়ামীলীগের পাশাপাশি বিএনপি‘র দলে এখানে কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। দলীয় নেতাকর্মীরাও পড়েছেন এ কোন্দলের মধ্যে।

সাবেক বিএনপি নেতা মফিকুল হাসান তৃপ্তি বাদে সবাই নতুন মুখ। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নতুন মুখ হলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের সমর্থন পাওয়ায় তারা নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

ইউনিয়ন থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতারা বলছেন, এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছে কেন্দ্রীয় নেতা মহসিন কবীর। তাছাড়া বিএনপির প্রবীন ত্যাগী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলী কদর (বর্তমানে আমেরিকায় আছেন) কেন্দ্রীয় নেতা মহসিন কবীরকে সমর্থন করায় এলাকার জনগণ এ নেতার প্রতি আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক নেতা মফিকুল হাসান তৃপ্তি এখনো আশা করছেন দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার। কিন্তু তার বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত সেটি সম্ভব নয় ভেবে তৃপ্তি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন দলে ফিরে আসার।

আর তৃপ্তি দলে ফিরে আসবেন এমন আশায় বিএনপি সমর্থিত একটি অংশ এখনো আশায় বুক বেধে দিন পার করছেন। তবে তৃপ্তি দলে এলে এখানকার বিএনপির চেহারা পাল্টে যাবে বলে অনেকে মনে করেন। তৃণমূল পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা অন্যান্য প্রার্থীর চেয়ে অনেক বেশি।

অপর প্রার্থী যশোর জেলা কমিটির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব শামছুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি। দলের দুর্দিনে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সভা সমাবেশ সহ বিভিন্ন দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। দলের কাছে তিনি মনোনয়ন চাইবেন। দলীয় ভাইস চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলামের আনুগত্য তিনি। বিএনপির একটি অংশের দাবি তিনি দলীয় মনোনয়ন অবশ্য পাবেন।  

এছাড়া শার্শা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান জহিরের নাম প্রার্থী হিসেবে শোনা গেলেও মনোনয়ন পাবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় তিনি নিজেও। তারপরও তালিকায় তার নাম উঠে এসেছে।

তবে সব কিছুর শেষ কথা দলীয় ভাইস চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলামের আর্শিবাদ যার ওপর থাকবে তিনিই হবেন জোটের প্রার্র্থী তেমনটি বলছেন এখাকার বিএনপির নেতাকর্মীরা।

জামায়াত : জামায়াত নির্বাচনের সুযোগ পেলে গত নির্বাচনে ৪ দলীয় জোটের প্রার্র্থী জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আজিজুর রহমান ফের জোটের মনোনয়ন লাভের চেষ্টা করবেন। বর্তমানে জামায়েত ইসলামীর একক প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সুরা সদস্য মাওলানা আজিজুর রহমান রয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায়। গত নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী আলহাজ্ব আফিল উদ্দীনের কাছে মাত্র ৫ হাজার ভোটে হেরে যান। এলাকায় তার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। জোটবদ্ধ ভাবে নির্বাচন হলে এ আসনে তিনিই জোটের প্রার্থী হিসেবে দাবিদার।

জাতীয় পার্টি : এ আসনে এবার জাতীয় পার্টির (এরশাদ) সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে যশোর জেলার সাবেক বিএনপি নেতা ও বেনাপোল উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি মফিজুর রহমান সজনের।

তাছাড়া  জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মফিজুর রহমান লিটনের এলাকায় পোষ্টার, ব্যানার থাকলেও তাকে এলাকায় দেখা যায় না। তবে বেনাপোল জাতীয় পার্টির পৌর কমিটির নেতৃবৃন্দ বলছেন তিনিও সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন।

এখানে জাতীয় পার্টির অসংখ্য কর্মী সমর্থক থাকলেও যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে দলটির কর্মী-সমর্থকরা হতাশ। এছাড়াও আওয়ামীলীগ বিএনপি‘র নেতাদের অর্থের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির নেতারা শুন্য। সে কারণে অনেকে দলটির হাল ধরতে পারছে না। এ কারণে দিনে দিনে দলের অনেক কর্মী সমর্থক আওয়ামীলীগ ও বিএনপির সাথে মিশে যাচ্ছে।

তবে এ আসনটিতে এবার বিভিন্ন দলের মধ্যে গ্রুপিং থাকায় কেন্দ্রীয় নেতারা দলের কোন না কোন পক্ষের ওপর ভর করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে নেতৃত্ব দিবেন। তবে  সাধারণ ভোটাররা বলছেন, এ আসনটিতে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন হলে আসনটি চলে যাবে জোটের দখলে।
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...
আরো সংবাদ পড়ুন