:: সাইফ বিন আইয়ুব ::
পেন্ডুলামের মতো দুলছে সিরিয়ার ভাগ্য। পুরো বিশ্বই উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে আছে সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে। উপর্যুপরি পশ্চিমা হুংকারে বাশার আল-আসাদের গদি যখন পড়ে যায় প্রায়, তখনই প্রশ্ন উঠেছে সংঘাত শুরু হওয়ার এতদিন পর মধ্যস্থতা আসলে কতটুকু প্রয়োজন।
আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন চাতুর্যপূর্ণ হুমকির পরও তাদের কেউই কিন্তু বাশার আল-আসাদকে উৎখাতে এতোটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। মূলত বাশারকে উৎখাত করে তার সরকারকেই একটু পরিবর্তন-পরিমার্জনের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায় কি না – এই নিয়ে গত দুই বছরে বিদ্রোহী গ্রুপ ও পশ্চিমা দেশগুলোর মাঝে বেশ কয়েকবার আলাপ আলোচনা হয়েছে। এই আলাপ-আলোচনার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সুযোগে বাশার নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার এবং বিদ্রোহ দমন করার যথেষ্ট সময় পেয়েছেন। যাই হোক, বর্তমানে বিদ্রোহীরা সিরিয়ার উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল এবং কিছু গ্রাম এলাকা দখলে নিয়ে নিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর হোমসের কিছু অংশ দখলে নেয়ার জোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা দখলে নিয়েছে রাজধানী দামেস্কের পূর্বাঞ্চল। তবে ছয়মাস আগে যুদ্ধে হিজবুল্লাহর অংশগ্রহণ বিদ্রোহী বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে রুখে দিয়েছিল। ঠিক যেমনিভাবে এখন পশ্চিমা দেশগুলোর হস্তক্ষেপ বর্তমান সময়ে বিদ্রোহী বাহিনীকে ক্ষমতার খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
কিন্তু রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারই কি পশ্চিমা হস্তক্ষেপের মূল কারণ? – প্রশ্ন উঠেছে এ নিয়ে। মনে রাখতে হবে, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার গত কয়েকটি যুদ্ধে বেশ সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে, যদিও পূর্বে এর ব্যবহার মোটেও ছিল না। প্রধানত দামেস্কের দিকে বিদ্রোহীদের ভয়ঙ্কর রকম অগ্রগতি এবং ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার সংকল্প বাশার আল-আসাদকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো বেপরোয়া করে তুলেছে। ব্রিটেনের তথ্যমতে, বাশার আল-আসাদ অন্তত ১৪টি বিভিন্ন এলাকায় রাসায়নিক অস্ত্রের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। যদিও এরকম আর কোন রিপোর্ট পশ্চিমা দেশগুলো হতে এখন পর্যন্ত আসে নি। এদিকে ব্রিটেনের মুখে কালি লেপে দিয়েছে স্বদেশি দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টের একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট। এক বছর আগে ব্রিটেনই সিরিয়ার কাছে রাসায়নিক অস্ত্র বিক্রি করেছিল বলে দৈনিকটি প্রকাশ করেছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে রাসায়নিক অস্ত্র পশ্চিমা হস্তক্ষেপের একটি অজুহাত মাত্র। সম্ভবত একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এই অস্ত্র সিরিয়ার কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। কেননা রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারে মারা গিয়েছে ১৫০০ মানুষ। পক্ষান্তরে বিমান হামলা এবং সরকারি গণহত্যায় মৃতের সংখ্যা বহু পূর্বেই এক লক্ষ ছাড়িয়েছে। সুতরাং বলা যেতে পারে – রাসায়নিক অস্ত্র আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর হস্তক্ষেপের মূল কারণ হতে পারে না।
তারপরও যদি আসাদ সরকার উৎখাতে সিরিয়ায় হামলা হয়েই থাকে তাহলে এই আগ্রাসন কি ভালো কিছু বয়ে আনবে – সবার মনে নীরবে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে এই প্রশ্ন। আমেরিকা ও ব্রিটেন সেই প্রথম থেকেই বলে আসছে, সিরিয়ার উপর হামলা হলে তা হবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এবং সেই হামলা আসাদ নিয়ন্ত্রিত সরকারে কোন পরিবর্তন আনবে না। জ্যা কারনি, হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব, গত ২৭ আগস্ট সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা এটা পরিস্কার করে বলতে চাই যে, সিরিয়ান সরকারে কোন পরিবর্তন আনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং আমরা বিশ্বকে এটা জানাতে চাই – আমেরিকা সবসময়ই রাসায়নিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান করবে।” ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও প্রায় একই মতামত ব্যক্ত করেছেন। The Institute for The Study of War সিরিয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলে, “ইউএস যুদ্ধ জাহাজগুলো এমন অবস্থানেই আছে যেখান থেকে সিরিয়ায় টমাহক মিসাইল ব্যবহার করা যায়। কিন্তু আসাদ সরকারের উপর যে কোন হামলা রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারকে আরও উস্কে দিতে পারে। যেটা কোনভাবেই কাম্য নয়।”
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এই অযাচিত হস্তক্ষেপের পরিবর্তে মুসলিম দেশগুলো বিশেষ করে তুরস্ক ও মিশর কি কোনরকম হস্তক্ষেপ করতে পারে না? এক্ষেত্রে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, আসাদ সরকার উৎখাতের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সামরিক শক্তি থাকলেও মিশর ও তুরস্ক মূলত দর্শকের ভূমিকাতেই থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।
ধরা যাক, সবকিছুর পর আমেরিকা ও তার দোসররা মিলে বাশার আল-আসাদকে উৎখাত করেই বসলো, সেক্ষেত্রে আসাদের পরিবর্তে কে সিরিয়ার ক্ষমতায় বসবে? – প্রশ্ন থেকেই যায়। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংঘাতময় পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বমোট তিনটি পথ খোলা আছে। প্রথমত, আমেরিকা যা চাচ্ছে অর্থাৎ, নতুন কিছু মুখ জাতীয় নেতৃত্বে এনে বর্তমান বাশার আল-আসাদ সরকারকেই ( যদি সম্ভব হয়) বহাল রাখা। অপরদিকে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর অবস্থান হচ্ছে, আসাদ সরকারকে সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করে আলোচনার মাধ্যমে নতুন কাউকে সিরিয়ার গদিতে বসানো। এই লক্ষ্যে ফ্রান্স ও ব্রিটেন ইতোমধ্যে “ফ্রেন্ডস অফ সিরিয়া” নামে একটি সংগঠনও গঠন করেছে। যেটি সিরিয়ার মাটিতে যুদ্ধ করার পরিবর্তে লন্ডন ও প্যারিসেই বেশি সময় ব্যয় করছে।
তৃতীয়ত, কয়েক দশক আগে সিরিয়া থেকে নির্বাসিতদের একটি দল শেষ পথটি দেখাতে চাচ্ছে। তাদের দাবি, বর্তমান শাসক এবং পশ্চিমাদের সাথে কোনরূপ আলাপ-আলোচনা চলতেই পারে না। অবশ্য জুনের তৃতীয় সপ্তাহে আল জাজিরা টিভি চ্যানেল যুদ্ধরত একজন বিদ্রোহী দলপ্রধানের সাক্ষাৎকার প্রচার করে। সেখানে সেই দলপ্রধান দাবি করেন – বাশার পরবর্তী সিরিয়া অবশ্যই ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। ইসলামি কোন দল ছাড়া অন্য কোন মদদপ্রাপ্ত গোষ্ঠী সিরিয়ার ক্ষমতা নিতে পারবে না।
কিন্তু যে সংঘাত-বিদ্রোহ নিয়ে এতো জল্পনা-কল্পনা - প্রশ্ন উঠেছে সেই বিদ্রোহ নিয়েও। যুদ্ধরত বিদ্রোহী গ্রুপগুলো আদৌ কি বাশার সরকারের বিরুদ্ধে কোন সাফল্য পাচ্ছে? খোলা দৃষ্টিতে অন্তত বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর সফলতাই সবার চোখে পড়ছে। বিদ্রোহের আড়াই বছরে বিদ্রোহী গ্রুপগুলো সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল দখলে নিয়ে নিয়েছে। যদিও বাশার বাহিনী এর দখল নিতে এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলেও জোর লড়াই চলছে দুই বাহিনীর মধ্যে। দামেস্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশেও প্রচণ্ড লড়াই চলছে বলে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো প্রচার করছে। তবে গত ছয় মাস পূর্বে হিজবুল্লাহ নাটকীয়ভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং বিদ্রোহী বাহিনীকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। সম্প্রতি ইরানও হুঙ্কার দিয়ে বলেছে যে, বাশার সরকারের পতন কখনই হবে না।
ইরানের হুঙ্কারের পরও বিদ্রোহিগ্রুপগুলো দিন দিন আক্রমণাত্মক হচ্ছে এবং নতুন নতুন এলাকা দখলে নিচ্ছে। তবে বিদ্রোহিদের নিয়ন্ত্রনে অধিকাংশ গ্রামাঞ্চল থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ গ্রামগুলি এখনও সরকারি বাহিনীর হাতেই রয়েছে। সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হল – বিদ্রোহীদের এই সাফল্যেই পশ্চিমা দেশগুলো বাশার সরকারের পতন দেখে ফেলছে।
তবে সত্যিকারের পতন ঘটবে কি ঘটবে না তা দেখার জন্য বিশ্বকে বোধহয় আরও কিছুদিন দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতেই হবে।
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...
আরো সংবাদ পড়ুন