যশোরের ৬টি আসনের মধ্যে যশোর-৪, যশোর-৫ এবং যশোর-৬ আসনে মনোনয়নের জন্য প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। জামায়াত ও জাতীয় পার্টিতে প্রার্থী রয়েছেন একজন করে। জাতীয় পার্টি অনেক আগেই এসব আসনে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করায় তাদের মাঠে দলীয় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। সবমিলে এ ৩টি আসনে মনোনয়নের আশায় ২৩ প্রার্থী  নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ ৩টি আসনের মধ্যে দুটি আসনে (যশোর-৪ এবং যশোর-৬) এবার নির্বাচন হবে অনেকটা উৎসব আয়োজনে। কারণ ওই দুটি আসনের নেতাকর্মীরা তাদের আসন পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন। আগে বাঘারপাড়া ও অভয়নগর উপজেলা মিলে ছিল যশোর-৪ আসন। কিন্তু বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সদর উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন কেটে নিয়ে বাঘারপাড়ার সঙ্গে যুক্ত করে বাঘারপাড়াকে যশোর-৪ আসন করা হয়। অন্যদিকে অভয়নগরকে জুড়ে দেয়া হয় যশোর-৬ ( কেশবপুর) আসনের সঙ্গে। এতে উভয় আসনের মানুষকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। এজন্য তারা আসন পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে জোর আন্দোলন করেন। যা সার্থকও হয়। এজন্য এ দুটি আসনে এবার বিরাজ করছে ভিন্ন মাত্রা। সেই সঙ্গে পাল্টে গেছে এ দুটি আসনের নির্বাচনী হিসাব-নিকাশও।
যশোর-৪ ( বাঘারপাড়া-অভয়নগর): বাঘারপাড়া এবং অভয়নগর উপজেলা মিলে যশোর-৪ আসন গঠিত। তবে গতবার যশোর সদর উপজেলার ৫টি এবং বাঘারপাড়া উপজেলা নিয়ে যশোর-৪ আসন ছিল। নির্বাচন কমিশন সর্বশেষ যেভাবে আসন পুনর্বিন্যাস করেছে, তাতে যশোর-৪ আসনকে পূর্বের অবস্থায় নেয়া হয়েছে। বিগত তত্ত্বাধায়ক সরকার অধীনে হওয়া নির্বাচনে এ আসনে চারদলীয় জোট থেকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব এবং মহাজোট থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রণজিত কুমার রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাতে বিজয়ী হন রণজিত কুমার রায়। তবে এ আসনে এবার সবচেয়ে বড় চমক হলো গতবার বিজয়ী রণজিত রায় আর আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন না। তিনি নিজেই সেটি নিশ্চিত করেছেন। এজন্য এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকা ছোট হলো। এখন মনোনয়নের লক্ষ্যে যারা মাঠে রয়েছেন তারা হলেন, বর্তমান এমপি (সাবেক যশোর-৬ থেকে নির্বাচিত) ও হুইপ আওয়ামী লীগের শেখ আবদুল ওহাব, সাবেক এমপি শাহ হাদিউজ্জামান, সাবেক পৌর মেয়র এবং অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এনামুল হক বাবুল এবং আমজাদ হোসেন, বিএনপির ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব, ড. মামুন রহমান এবং ফারাজী মতিয়ার রহমান। জাতীয় পার্টির জহুরুল ইসলাম এবং জামায়াতের গোলাম রসুল। প্রার্থীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি ছাড়াও সময়-সুযোগ পেলেই তাদের নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে গণসংযোগ করছেন। দলীয় কর্মীরা যে আভাস দিচ্ছেন তাতে বিএনপির প্রার্থী বদল না হলেও নতুন মুখ আসতে পারে আওয়ামী লীগে। শেখ আবদুল ওহাবকে পেছনে ফেলে এ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন সাবেক এমপি ও বর্তমান যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক প্রবীণ রাজনীতিবীদ শাহ হাদিউজ্জামান অথবা এনামুল হক বাবুলের মধ্যে যে কেউ। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে অভয়নগর উপজেলা থেকে যাওয়া নেতারা অধ্যক্ষ শেখ আবদুল ওহাবকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে মতামত দিয়েছেন বলে দলীয় সুত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে টিএস আইয়ুব বিএনপির প্রার্থী হওয়াটা অনেকটা নিশ্চিত বলে অনেকে মনে করলেও তার বিপক্ষে শক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পারেন খুলনার ফুলতালা জামিরা ইউনিয়নের বাসিন্দা লন্ডন প্রবাসী ধনাঢ্য ব্যক্তি ড. মামুন রহমান।
যশোর-৫ (মণিরামপুর): আয়াতন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে মণিরামপুর দেশের বড় উপজেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ উপজেলায় ১৭টি ইউনিয়ন রয়েছে। বিগত নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে অ্যাড. খান টিপু সুলতান এবং চারদলীয় জোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মুফতি মুহম্মদ ওয়াক্কাস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাতে বিজয়ী হন অ্যাড. খান টিপু সুলতান। এবারো এ দুই প্রার্থী মানোনয়ন পাওয়ার জন্য মাঠে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে আরো অনেকেই চেষ্টা করছেন দলীয় মনোনয়ন লাভের জন্য। তারা হলেন, আওয়ামী লীগ নেতা এবং মণিরামপুর উপজেলা চেয়রম্যান স্বপন ভট্টাচার্য, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসান, কামরুল হাসান বারি, বিএনপির উপজেলা কমিটির সভাপতি শহীদ ইকবাল হোসেন ও আলহাজ্ব মোহাম্মদ মুসা, অ্যাড.এবিএম গোলাম মোস্তফা তাজ, জামায়াতে ইসলামীর অ্যাড. গাজি এনামুল হক এবং জাতীয় পার্টির শরিফুল ইসলাম চৌধুরী।
এবার এ আসনে উভয় জোট থেকেই প্রার্থী বদল করা হতে পারে বলে জোর প্রচার রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ থেকে স্বপন ভদ্র এবং বিএনপি থেকে শহীদ ইকবাল হোসেন মনোনয়ন পেতে পারেন। এজন্য তারা জোর লবিংও চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে মণিরামপুর উপজেলা থেকে যাওয়া নেতারা এ আসনে আবারো বর্তমান এমপি টিপু সুলতানকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে মতামত দিয়েছেন।
যশোর-৬ ( কেশবপুর): আসন পুনর্বিন্যাস হওয়ায় সবচেয়ে লাভবান হয়েছেন কেশবপুর থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। গত নির্বাচনে এ উপজেলার সঙ্গে অভয়নগর উপজেলা জুড়ে দেয়া হয়েছিল। তাতে এ উপজেলার মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মনোনয়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ জন্য সব দলের নেতাকর্মীরা কেশবপুরকে পৃথক আসন করার জন্য প্রায় এক বছর ধরে আন্দোলন করেন। শেষ পর্যন্ত তাদের লড়াই সফল হয়। নির্বাচন কমিশন কেশবপুরকে পৃথক আসন ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে এ আসনে প্রার্থীর তালিকাতেও পরিবর্তন আসে। বিগত নির্বাচনে এ আসনে প্রার্থী ছিলেন আওয়ামী লীগের অধ্যক্ষ শেখ আবদুল ওহাব এবং বিএনপির উপজেলা সভাপতি আবুল হোসেন আযাদ। আসন পুনির্বন্যাস হওয়ায় এবার আর এ আসনে প্রার্থী হবেন না বর্তমান এমপি অধ্যক্ষ শেখ আবদুল ওহাব। তবে বিএনপি থেকে মনোয়নের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গতবারের প্রার্থী আবুল হোসেন আযাদ। এ ছাড়াও যারা মাঠে আছেন তারা হলেন, আওয়ামী লীগ থেকে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেকের স্ত্রী ইসমত আরা সাদেক, আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ্ব শেখ আবদুর রফিক, উপজেলা চেয়ারম্যান এইচএম আমির হোসেন ও এসএম রুহুল আমিন। বিএনপির উপজেলা সভাপতি ও গতবারের প্রার্থী আবুল হোসেন আযাদ, বর্তমান পৌর মেয়র আবদুস সামাদ বিশ্বাাস এবং বিএনপি নেতা আবু বকর আবু। জাতীয় পার্টি থেকে মাওলানা শাখাওয়াত হোসেনের মনোনয়ন চূড়ান্ত হলেও যুদ্ধাপরাধসহ বিভিন্ন মামলার কারণে তিনি এলাকায় নেই। অন্যদিকে জামায়াত থেকে প্রচারণা চালাচ্ছেন অধ্যাপক মুক্তার আলী।
স্থানীয়দের ধারণা আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে ইসমত আরা সাদেক এবং বিএনপি থেকে আবুল হোসেন আযাদ মনোনয়ন পেতে পারেন। তবে জামায়াত বিএনপির কাছে এ আসনটি চাইতে পারে। সে ক্ষেত্রে দিধাদ্বন্দ্বে আছেন বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। স্থানীয়দের ধারণা প্রার্থী নির্বাচনে ভুল না করলে যশোরের এ আসনটি ধরে রাখতে পারবে আওয়ামী লীগ।
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...
আরো সংবাদ পড়ুন