মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত পদ্মার শাখা নদী মধুমতি তীরবর্তী তিনটি ইউনিয়নের ২০টি
গ্রামে ভাঙন আবার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীতীরবর্তী গ্রামের লোকজনের মধ্যে এখন বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। সর্বস্ব হারানোর ভয়ে দিন কাটছে শত শত পরিবারের। মধুমতি গ্রাস করছে আবাদি জমি, বসতভিটা বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ, গোরস্থান, ঈদগাহ ও মাদরাসাসহ অসংখ্য স্থাপনা। ভাঙন প্রতিরোধের জন্য ইউএনও মোহাম্মদ সামছুদ্দৌজা আট কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছেন। স্থানীয় লোকজন জানান, এক সপ্তাহজুড়ে অবিরাম বর্ষণে মধুমতির ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। কয়েক হাজার একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। গৃহহারা হয়েছেন অনেকে। ভাঙন কাছে চলে আসায় লোকজন নিরাপদ জায়গায় বসতবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন। বন্যা নিয়šণ বাঁধ, গোরস্থান, ঈদগাহ, মাদরাসা, হাটবাজার, ফসলি জমি ও বসতভিটা থেকে মাত্র ১০-২৫ হাত দূরে দাঁড়িয়ে ফুঁসছে মধুমতি; কিন্তু উপজেলাকে মধুমতির হাত থেকে রা করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোনো উদ্যেগ নেই। সূত্র আরো জানায়, মহম্মদপুর উপজেলার পূর্ব সীমান্ত দিয়ে পদ্মার শাখা নদী মধুমতি বয়ে গেছে। প্রমত্তা মধুমতি ষাটের দশকে লোকালয়ে প্রথম আঘাত হানে। আশির দশকে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। নদীর তীরবর্তী উপজেলার দণি সীমান্তে কালিশংকরপুর থেকে উত্তর সীমান্তে চরছেলামতপুর পর্যন্ত প্রায় ২০টি গ্রামে শুরু হয় ভায়াবহ ভাঙন। এতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ হাজার হাজার একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয় অসংখ্য পরিবার। মধুমতি তীরবর্তী উপজেলার পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের ঝামা, আড়মাঝি, দেউলী, যশোবন্তপুর, কালিশংকরপুর, সদর ইউনিয়নের গোপালনগর জাঙ্গালীয়া, কাশিপুর, ধুলজুড়ী, মুরাইল, রায়পাশা, ভোলানাথপুর, পাচুড়িয়া, রুইজানী, দীঘা ইউনিয়নের পাল্লা, শিরগ্রাম, চরপাড়া, বাবুখালী ইউনিয়নের চরছেলামতপুর মধুমতি তীরবর্তী হওয়ায় ভাঙনকবলিত। এসব এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ জায়গাজমি, ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। গৃহহারা এসব মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন বাঁধ ও চরাঞ্চলে। সবচেয়ে ভাঙনকবলিত এলাকা হচ্ছে সদর ও পলাশবাড়িয়া ইউনিয়ন। সরেজমিন মধুমতির ভাঙন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মহম্মদপুর সদর, দীঘা, পলাশবাড়িয়া ও বাবুখালী ইাউনিয়নের পাশ দিয়ে প্রবাহিত মধুমতির পূর্ব তীরে প্রায় তিন কিলোমিটার ভেঙে গেছে। মহম্মদপুর সদর ইউনিয়নের গোপালনগর জাঙ্গালীয়া, কাশিপুর, ধুলজুড়ী, মুরাইল, রায়পাশা, ভোলানাথপুর, পাচুড়িয়া, রুইজানী ও পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের ঝামা, আড়মাঝি, দেউলী, যশোবন্তপুর, কালিশংকরপুর গ্রামগুলো তীব্র ভাঙনকবলিত। নদী ক্রমেই বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের দিকে এগিয়ে আসছে। ২০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এ বাঁধ ভেঙে গেলে হুমকির মুখে পড়বে উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। উপজেলা সদরের কাশিপুর পয়েন্টে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থেকে নদী মাত্র কয়েক গজ দূরে রয়েছে। এতে প্রাচীন কাশিপুর কবরস্থান, কাশিপুর ঈদগাহ, মাদরাসাসহ অনেক শিাপ্রতিষ্ঠান, অসংখ্য বাড়িঘর ও ফসলি জমি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগ না নিলে চলতি মওসুমেই এসব স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। গোপালনগর থেকে পাল্লøা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর মাঝ বরাবর জেগে উঠেছে স্থায়ী চর। চরের কারণে নদীর স্রোতধারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এতে স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে প্রবল বেগে তীরে আছড়ে পড়ছে। ফলে উপজেলা সদরের নদীতীরবর্তী জনপদ ক্রমেই ভাঙনের উন্মত্ত থাবায় নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। মধুমতির ভাঙনরোধে বিভিন্ন সময়ে আশ্বাসের বাণী শুনালেও কার্যকর কোনো পদপে নেয়নি কেউ। বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে উপজেলা সদরের থানা ভবন রার জন্য পাউবো মাত্র এক কিলোমিটার নদীতীরে আরসিসিসি ব্লক স্থাপন করে। পরে বর্তমান সরকার আরো আধা কিলোমিটার ব্লøক স্থাপনের কাজ সম্প্রসারণ করে, যা প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য। এতে নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা অরতি থেকে যায়। এ ছাড়া থানা ভবনের সন্নিকটে জাঙ্গালিয়া গ্রামে শহর রাবাঁধে গত বছরের বন্যায় ধস নামে। আরসিসি ব্লøকের একটি বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। তিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত না করায় হুমকিতে রয়েছে এ শহর রাবাঁধ। মধুমতি নদী তীরবর্তী কাশিপুর গ্রামের বাসিন্দা ও নদীভাাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ডাক্তার তিলাম হোসেন বলেন, মধুমতির ভাঙনরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। মহম্মদপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান বলেন, নদীভাঙন রোধের জন্য পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী এ এলাকা পরিদর্শন করেছেন; কিন্তু তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। মাগুরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী গৌরপদ সূত্রধর বলেন, নদীশাসন অত্যন্ত ব্যয়বহুল কাজ। বরাদ্দপেলে কাজ শুরু হবে। চলতি বর্ষায় মধুমতির ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপকে অবহিত করা হয়েছে। মহম্মদপুরের ইউএনও মোহাম্মদ সামছুদ্দৌজা বলেন, চলতি মওসুমে মধুমতির ভয়াবহ ভাঙন প্রতিরোধের জন্য আট কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। মাগুরা-২ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট বীরেন শিকদার বলেন, চলতি বছরেরগোড়ার দিকে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও আমি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট প্রকল্পের আওতায় অর্থপ্রাপ্তির একটি আবদন বিবেচনাধীন রয়েছে। শিগগিরই কাজ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।