জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে ঝিনাইদহের রাজনৈতিক মাঠ দখলে নিতে
বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠনগুলো। তারা বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় মাঠ দখলে একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে চলেছে।
এসব সন্ত্রাসীদের হাতে গত ৪ মাসে ইউপি চেয়ারম্যান ও রাজনৈতিক নেতাসহ খুন হয়েছে ২৩ জন। এসব খুন রাজনৈতিক কোন্দল, অপহরণ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থীদের আন্তঃকোন্দলের কারণে ঘটেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ফলে জেলার মানুষের মধ্যে একটা অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পুলিশ ও র‌্যাব হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে অপরাধীদের আটক করলেও রাজনৈতিক তদবির ও ক্ষেত্র বিশেষে আইনের ফাঁক গলিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে এসে সন্ত্রাসীরা আবার অপরাধ মুলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এ জেলার নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে চলেছে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে সানার উদ্দিন (৫৫) নামে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। নিহত সানার উদ্দিন সদর উপজেলার হরিশংকরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আর্য্যনারায়ণপুর গ্রামের গোলাম রব্বানী মন্ডলের ছেলে।
এছাড়া গত ২১ আগস্ট ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় জোছনা খাতুন (৩২) নামে এক গৃহবধূকে কুপিয়ে ও একই দিন মফিজ উদ্দিন (৩৭) নামে এক চরমপন্থী সন্ত্রাসীকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ওই দিন সকালে পুলিশ রূপদাহ গ্রামের মাঠ থেকে ক্ষত-বিক্ষত গৃহবধূ জোছনার ও চান্দেরপোল গ্রামের নুড়কিতলা মাঠ থেকে মফিজ উদ্দিন নামে এক চরমপন্থী সন্ত্রাসীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
৫ আগস্ট নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের লিটন (৩৪) নামে এক সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। নিহত লিটন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের বাক্কা মিয়ার ছেলে। ২ আগস্ট ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার রুদ্রপুর গ্রামের বাবার বাড়ির বারান্দা থেকে বিলকিস (৩৫) নামে এক গৃহবধূর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
১৭ জুলাই ঝিনাইদহে দুই চরমপন্থী নেতাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা। সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের লক্ষীপুর বেলে মাঠে একটি আমবাগানে তাদের লাশ পাওয়া যায়। নিহতরা হলেন, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হাজীডাঙ্গা গ্রামের সাদেক হোসেনের ছেলে উজ্জল হোসেন ও একই গ্রামের নুর বক্সের ছেলে আসাদুল ইসলাম। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ত্রাস, চরমপন্থী নেতা আবদুর রশিদ ওরফে দাদা তপন পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর এ অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করছিলেন নিহত উজ্জল ও আসাদুল। চরমপন্থি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তারা খুন হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এছাড়া, ১৪ জুলাই রোববার রাত ৯টার দিকে সদর উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামে শহিদুল ইসলাম নামে এক চরমপন্থী দলের সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ১২ জুলাই ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার কাপাশহাটিয়া গ্রামের দুবাই প্রবাসি দুলাল মিয়ার ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র আসাদকে সন্ত্রাসীরা মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের পর হত্যা করে। ১১ জুলাই ঝিনাইদহের শৈলকূপায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ফজের উদ্দীন (৩৫) নামের এক আ’লীগ কর্মী নিহত হয়।
৯ জুলাই বারবাজারের মিঠুন হোসেন নামের এক যুবলীগ নেতাকে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে। ৮ জুলাই ঝিনাইদহের শৈলকূপায় অজ্ঞাতনামা (৪২) এক ব্যক্তির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উপজেলার মীনগ্রামের মাঠের মধ্যে একটি বটগাছ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ৫ জুলাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মধুপুর বাজার থেকে পুলিশ আজাদ হোসেন নামে অষ্টম শ্রেণীর এক মাদ্রাসা ছাত্রের দ্বিখন্ডিত ও গলিত লাশ উদ্ধার করে। ২৮ জুন দুর্বৃত্তরা তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। একইভাবে ৩০ জুন অপহরণের পর খুন হয় ঝিনাইদহে সুলতান আহমেদ (৪৫) নামে এক ঠিকাদার। একই সময় জেলার মহেশপুর পুড়াপাড়া গ্রামের আব্দুল কাদের নামের একজনকে পিটিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
তিনি ওই গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে। ২৬ জুন একই উপজেলার জুগিহুদা গ্রাম থেকে ইলিয়াস হোসেন নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগের রাতে তাকে অপহরণ করা হয়। ১৬ জুন নলডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও চরমপন্থী নেতা রুহুল বিশ্বাসকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত রুহুল বিশ্বাস কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নানের আর্শিবাদপুষ্ট ছিলেন। ১১ জুন সন্ত্রাসীদের দায়ের কোপে খুন হন কালীগঞ্জ উপজেলার সিংদিহী গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা খাইরুল ইসলাম। ১৫ মে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার আলমডাঙ্গা গ্রাম থেকে হাসমত আলী (৫৫) নামে এক ব্যক্তির গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৩ মে ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার দোলুয়াখালি গ্রামের ক্যানেলের ধারে শাহাবুল ইসলাম ওরফে শাবু (৩০) নামের এক যুবককে গলা কেটে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ১ এপ্রিল বারবাজারের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রউফকে দিনের বেলা কুপিয়ে ও বোমা মেরে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্বের কারণে তারা খুন হয় বলে জানা গেছে।
এভাবে একের পর এক খুনের ঘটলেও পুলিশের তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যরা।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন জেলার আইন শৃঙ্খলার অবনতি হয়নি দাবি করে বলেন, সরকারের শেষ মুহূর্তে কিছু চরমপন্থী সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে আসার ফলে এই হত্যাকান্ড ঘটছে। এছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, কিছু হত্যাকান্ড ঘটছে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে কারণে। তবে, আমরা চেষ্টা করছি তা কঠোর হাতে দমন করতে।
সাম্প্রতিক সংবাদ সমূহ