যে ফ্লাটে দীর্ঘ দিন বাবা-মা আর ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করেছে সেই ফ্লাটেই এক সপ্তাহ পর গত বুধবার রাতে ফিরেছিল আবার এতদিন ঐশী বলে আসছিল, ঘুমের ওষুধ সে বন্ধু জনির কাছ থেকে পেয়েছে। বুধবার রাতে নতুন তথ্য দিয়ে ঐশী জানিয়েছে, শান্তিগরের একটি দোকান থেকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে ওষুধগুলো সে নিজেই কিনেছে। ওই প্রেসক্রিপশনটি দিয়েছিল বন্ধু জনি। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে শান্তিনগরের কয়েকজন ওষুধ ব্যবসায়িকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।
বুধবার রাতে ঐশীকে যখন ওই ফ্লাটে নিয়ে যাওয়া হয় তখন গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বরও তাদের সঙ্গে ছিলেন। ঘণ্টা দুইয়েক ঐশী ওই ফ্লাটে ছিল। ওই সময় ফ্লাটে উপস্থিত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, নিজের ফ্লাটে গিয়ে ঐশী হত্যাকাণ্ডের পুরো বর্ণনা দিয়েছে; কিন্তু তার গল্পগুলো ছিল খুবই অগোছালো। বন্ধুদের ফ্লাটে প্রবেশ ও বের হওয়া নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তিকর তথ্য। ফলে ঐশীর দেয়া বক্তব্য বিশ্বাস হচ্ছে না তাদের।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, নিজ ফ্লাটে ঐশী তাদের বলেছে, সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে কফির সঙ্গে মাকে ঘুমের ১০টি ওষুধ খাওয়ানোর পর ড্রইং রুমের ফ্লোরে মাদুরের উপরই তার মা শুয়ে পড়ে। এ সময় তার মা অস্বস্তি লাগছে জানালে ঐশী তাকে লেবুর শরবত খাওয়ায়। কিছুক্ষণের মধ্যে মাদুরের উপর তার মা ঘুমিয়ে পড়ে। এরপর রাত ৯টার দিকে গাড়ি নিয়ে তাদের চামেলী ম্যানশনে প্রবেশ করে আসাদুজ্জামান জনি ও সাইদুল ইসলাম। তারা ফ্লাটে আসার পর ঐশী দরজা খুলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তাদের ড্রইং রুমের বাথরুমে নিয়ে রাখে ঐশী। ঐশীর তথ্য অনুযায়ী গৃহকর্মী সুমি আর সে তখন ড্রইং রুমে বসে টেলিভিশন দেখছিল; কিন্তু সুমি তাদের দেখতে পায়নি। রাত ১০টার দিকে ঐশী তার মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে বাসায় ফেরার তাগাদা দিয়ে বাবাকে তিন বার ফোন করে। রাত ১১টার দিকে তার বাবা বাসায় ফেরার পর দেখেন তার মা ড্রইং রুমে ঘুমাচ্ছে। ডেকে তোলার চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন। পরে ঐশী ও তার বাবা মাকে ধরে বেডরুমে নিয়ে যায়। তখনো তিনি ঘুমাচ্ছিলেন।
ঐশীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী পরে বাবাকে নিজেই খেতে দেয়। রাতের খাবার শেষে ঐশী তার বাবাকে কফি খাওয়ার অনুরোধ করে; কিন্তু তিনি রাজি হচ্ছিলেন না। ঐশী তখন বাবাবে বলে, বানানো আছে, শুধু গরম করলেই হবে। ঐশীর পীড়াপীড়িতে বাবা কফি খেতে রাজি হন। কফি খাওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে তার বাবা ঐশীর রুমে ঘুমিয়ে পড়েন। তখন ঐশী আর সুমি ড্রইং রুমে বসে টিভি দেখছিল। এক পর্যায়ে সুমি সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। রাত ৩টার দিকে বাথরুম থেকে দুই বন্ধুকে বের করে আনে ঐশী। ড্রইং রুমের সোফায় বসে কিছুক্ষণ এসব নিয়ে আলোচনার পর রাত ৩টার দিকে ছুরি (খঞ্জর) নিয়ে নিজেই মাকে প্রথম কোপ দেয়। কয়েকটি কোপ দেয়ার পর জনি এসে তার কাছ থেকে ছুরি নিয়ে কোপাতে থাকে। এ সময় ছোট ভাই জেগে উঠলে ঐশী তাকে বাথরুমে নিয়ে যায়। তখনই দুই বন্ধু তার বাবাকে খুন করে। এরপর তারা বাসাতেই অবস্থান করে। সকাল ৮টার দিকে ছোট ভাই ও সুমিকে নিয়ে সে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। এর ঘণ্টা খানেক পর দুই বন্ধু বাসা থেকে বের হয়।
তদন্তকারী একজন কর্মকর্তা বলেন, ঐশী যখন এই বর্ণনা দিচ্ছিল তার কাছে প্রশ্ন ছিল, সুমির সামনেই যখন দুই বন্ধু বাসায় ঢুকল তখন সুমি তাদের দেখেছিল কি-না, বন্ধুরা বাসায় থাকার পরও সুমিকে কেন ঘুম থেকে ডেকে লাশ সরাতে হলো, সে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তালা দিয়ে বের হলো; কিন্তু তারপর বন্ধুরা কিভাবে বাসা থেকে বের হলো? হত্যাকারী আরো দুই বন্ধু হলে ছুরি কেন একটাই ব্যবহার করা হলো? এর কোন প্রশ্নেরই সদুত্তর ঐশী দিতে পারেনি। গোজামিল দিয়ে গোয়েন্দাদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন। ফলে গোয়েন্দারা তার কথায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
জিজ্ঞাসাবাদকারীরা বলেন, আসলে ঐশী খুবই চতুর প্রকৃতির। বয়স নিয়ে বিতর্ক উঠায় জিজ্ঞাসাবাদে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। আর সেই সুযোগ নিচ্ছে ঐশী। তবে তদন্তকারীরা এখন পর্যন্ত মনে করছেন, হত্যাকাণ্ড ঐশী একাই ঘটিয়েছে। এখন নিজেকে রক্ষা করার জন্য বন্ধুদের নিয়ে গল্প সাজাচ্ছে। তাই জনি ও সাইদুল গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত সুরাহা করা যাচ্ছে না। গতকাল ছিল তাদের ৫ দিনের রিমান্ডের চতুর্থ দিন। তাই এ দফা রিমান্ড শেষে পুনরায় তাকে রিমান্ডে আনার আবেদন করবে গোয়েন্দা পুলিশ। এদিকে গতকাল পর্যন্ত তার বয়স নির্ধারণের ফল জানা যায়নি। তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, খুলনার একটি ক্লিনিকে তার জন্ম। ওই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা নথি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার রাতে রাজধানীর চামেলিবাগের 'চামেলি ম্যানশনের' ছয় তলার বি-৫ নম্বর ফ্ল্যাটের তালা ভেঙ্গে পুলিশ দম্পতির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঐশীর কক্ষের বাথরুম থেকে চাদর দিয়ে প্যাঁচানো অবস্থায় লাশ দুইটি উদ্ধার করা হয়। দুইজনের শরীরেই ছিল উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে ছোট ভাই ওহি (৭) ও গৃহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ফ্ল্যাট ছাড়ে দম্পতির একমাত্র মেয়ে ঐশী। ছোট ভাইকে বাসায় পাঠিয়ে দিলেও ঐশি পলাতক ছিল। শনিবার দুপুরে পল্টন থানায় গিয়ে ধরা দেয় ঐশী।
ঐশী; কিন্তু এবার আর রাত যাপনের জন্য নয়, বাবা-মায়ের খুনের বর্ণনা দিতেই গোয়েন্দারা তাকে ওই ফ্লাটে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে লাশ সরানো আর নিজেদের বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার বর্ণনা দিয়েছে সে; কিন্তু তার এলোমেলো বক্তব্য গোয়েন্দাদের আরো বিভ্রান্ত করেছে। খুনের সঙ্গে দুই বন্ধু থাকার গল্প সে বললেও তারা কিভাবে এসেছে, কোথায় ছিল, কিভাবে গেল তা পরিষ্কার করতে পারেনি ঐশী।
সাম্প্রতিক সংবাদ সমূহ
0 মন্তব্যসমূহ