আর মাত্র ৫ দিন পরই কোরবানির ঈদ। ক্রমেই জমে উঠছে কোরবানির পশুর হাট। তবে গরু বা ছাগল নিয়ে আসার
পথে রাস্তায় পুলিশ ও মাস্তানদের চাঁদাবাজি এবং গরু ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তাহীনতায় হতাশ পশু ব্যবসায়ীরা।
প্রতিবছর কোরবানির সপ্তাহ বা ১০ দিন আগে চট্টগ্রামের কোরবানির পশুর হাটগুলো পুরোপুরি জমে ওঠে। কিন্তু এবারের চিত্র একটু ভিন্ন। এবার ধীরে ধীরে জমে উঠছে পশুর হাট। গরু আছে, বিক্রেতা আছে; কিন্তু ক্রেতার সংখ্যা কম। একদিকে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ভালো নেই সাধারণ মানুষ। যার প্রভাব পড়ছে কোরবানির পশুর হাটগুলোতেও। বাজারে আশানুরূপ ক্রেতা না থাকায় ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা অনেকটা হতাশ। ঈদের আগের দিন রাতভর পর্যন্ত বেচাকেনা চলায় শেষ মুহূর্তে বাজার জমে ওঠার আশায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে অন্যবারের মতো এবারও ভারতীয় ও মিয়ানমার (বার্মা) থেকে গরু ঢুকতে দিলে দেশীয় গরুর ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। ক্রেতারা ভারতীয় ও বার্মিজ গরু বাজারে আসার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। বিবিরহাট এলাকা গরু কিনতে আসা মোর্শেদ, ইদ্রিস আলী ও বাবলুসহ কয়েকজন ক্রেতা জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে গরু আসার সুযোগ করে দিলে সাধারণ মানুষ কিছুটা কম দামে কোরবানির পশু কিনতে সক্ষম হবেন। একই সঙ্গে গরু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটও ভেঙে যাবে বলে তারা জানান।
চট্টগ্রাম মহানগরীতে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে ৮টি স্থানে কোরবানির পশু বিক্রি করা হয়। স্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে সাগরিকা ও বিবিরহাটবাজার। নগরীর পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও রয়েছে স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাট। সাপ্তাহিক হাটের দিন নির্ধারিত থাকলেও কোরবানি উপলক্ষে প্রতিদিনই গরু-ছাগল বেচাকেনা হয়। নগরীতে স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর মধ্যে কর্ণফুলী সেতু, চান্দগাঁও থানা সংলগ্ন এক কিলোমিটার, পতেঙ্গা ঈশান মিস্ত্রিহাট অন্যতম। এসব অস্থায়ী হাটেও কোরবানি উপলক্ষে সকাল-সন্ধ্যা এমনকি রাতভর পর্যন্ত কোরবানির পশু বিক্রি হয়ে থাকে। চট্টগ্রামের অন্যতম পশুর হাট বিবিরহাট। কোরবানির বাজার উপলক্ষে এ দিন ব্যবসায়ীরা বিপুলসংখ্যক পশু হাটে তোলেন। কিন্তু ক্রেতার সংখ্যা আশানুরূপ না থাকায় হতাশ হন অনেক ব্যবসায়ী ও বিক্রেতা।
রাজশাহী থেকে ৩৩টি গরু বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে এসেছেন শফি উল্লাহ ব্যবসায়ী। প্রতিবছর কোরবানির বাজার ধরতে গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন পশুর হাট ও গৃহস্থের কাছ থেকে গরু কিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পশুর হাটে বিক্রি করেন। গত ২৫-২৬ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসা করে আসছেন। প্রতিবারের মতো এবারও গরু নিয়ে এসেছেন চট্টগ্রামে। সোমবার রাতে বিবিরহাটবাজারে পৌঁছে বাজারের আকর্ষণীয় জায়গাটিও দখল করতে সমর্থ হয়েছেন তিনি। কিন্তু মঙ্গলবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার হতাশাও বাড়তে থাকে। দুপুর পর্যন্ত হাটে কোনো ক্রেতা আসেননি। ঝিনাইদহ থেকে ২১টি গরু নিয়ে এসেছেন খোমিনী বিশ্বাস। মঙ্গলবার দুপুরে বিবিরহাটবাজারে এসে পৌঁছেন তিনি। তবে বাজারের ক্রেতার উপস্থিতি না দেখে ট্রাক থেকে গরু না নামিয়েই বাজারের এককোণে বসেছিলেন তিনি। তিনি জানান, আর কিছু সময় অপেক্ষা করব, ক্রেতার দেখা না মিললে অন্যহাটে যাওয়ার চিন্তা করব।
কুমিল্লা থেকে ৩টি ট্রাক বোঝায় করে ৭১টি গরু এনেছেন ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন। হাটে ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা বেশি থাকায় তুলনামূলক বেশি দাম দিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে ছোট আকৃতির গরু কিনে এনেছেন। সোমবার রাত থেকে লাইনে গরু দিয়ে বসে আছেন। তিনি জানান, অনেক সময় বাজার মন্দা যায়, তবে এবারের মতো মন্দা আগে কখনও যায়নি। নোয়াখালী থেকে ১৮টি নেপালি গরু এনেছেন ব্যবসায়ী আকবর হোসেন। জানালেন এবারের ঈদে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্কসহ বিভিন্ন কারণে বাজার মন্দা যাচ্ছে। তবে কোরবানির ঈদের বাজার ঈদের আগের দিন পর্যন্ত জমে। শেষ মুহূর্তে বাজার ধরতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। যশোর থেকে নিজের ফার্মের গরু নিয়ে আসা আলতাফ হোসেন জানান, প্রতিবছর ঈদের ২-৩ দিন আগে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করে। যার ফলে দাম পড়ে যায়। তাই আগে থেকেই গরুগুলো বিক্রি করার উদ্দেশ্যে হাটে তুলেছেন। কিন্তু হাটে ক্রেতা কম থাকায় হতাশ তিনি। এখন শেষ মুহূর্তের বাজার ধরার আশায় আছেন। তবে অন্যবারের মতো এবারও সীমান্ত পথে ভারতীয় ও বার্মিজ গরু দেশে এলে ব্যবসায়ীরা পথে বসবেন বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। বাজারে গরু বিক্রি করতে আসা ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার গরু ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দেয়ার কথা বললেও বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। কারণ রাস্তায় রাস্তায় এখনও পুলিশ ও মাস্তানদের চাঁদাবাজি চলছে। বাজার ব্যবস্থাপনায়ও অনেক ত্রুটি রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীদের বাজার সংলগ্ন এলাকায় থাকার মতো কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় তাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।